বসিরহাট সীমান্তে কাঁটাতার পরিকল্পনা, নিরাপত্তা বাড়লেও জমি ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কা সীমান্তবাসীর
বসিরহাট : বসিরহাটের সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন করে কাঁটাতার নির্মাণ এবং সীমান্তবর্তী জমি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর ও বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে স্বরূপনগর, বাদুড়িয়া, হিঙ্গলগঞ্জ, বসিরহাট ১নং ব্লক, বসিরহাট ও টাকি পৌর এলাকা এবং হাসনাবাদ ব্লকের নদী ও স্থল সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে এই সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষিকাজ, মৎস্যজীবী পেশা এবং নিরাপত্তা সব কিছুর উপরই সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
স্বরূপনগরের সীমান্তবর্তী হাকিমপুর, বালতি, গোবিন্দপুর ও তারালি সহ একাধিক গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের শেখ বলেন, “রাতে অনেক সময় সীমান্তের ওপার থেকে সন্দেহজনক যাতায়াত হয়। কাঁটাতার হলে অন্তত অনুপ্রবেশ আর সোনা-রুপো পাচার অনেকটা কমবে।” তার মতে, এলাকায় বহুবার চোরাচালান ও দুষ্কৃতীদের আনাগোনা নিয়ে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকেন। তবে একই সঙ্গে কৃষকদের একাংশের আশঙ্কা, নতুন ফেন্সিং হলে তাদের চাষের জমি কাঁটাতারের ওপারে চলে যেতে পারে। স্বরূপনগরের এক কৃষক নারায়ণ মণ্ডল বলেন, “আমার তিন বিঘে জমি সীমান্ত লাগোয়া। যদি কাঁটাতারের বাইরে পড়ে যায়, তাহলে প্রতিদিন চাষ করতে যেতে বিএসএফের অনুমতি নিতে হবে। এতে সময় নষ্ট হবে, ঝামেলাও বাড়বে।”
হাসনাবাদ ও টাকি অঞ্চলে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। এখানে ইছামতী নদী আন্তর্জাতিক সীমারেখা হওয়ায় পুরোপুরি কাঁটাতার সম্ভব নয়। ফলে নদীপথে নজরদারি, স্পিডবোট টহল, নদীঘাটে কড়াকড়ি বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে। টাকির ঘাট এলাকার এক নৌকাচালক সঞ্জয় দাস বলেন, “নিরাপত্তা বাড়ুক, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু নদীতে পর্যটক নিয়ে যাওয়া বা মাছ ধরা যদি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে পড়ে, তাহলে আমাদের আয় কমে যাবে।” হাসনাবাদের এক মৎস্যজীবী নুরুল গাজী বলেন, “আমরা নদীর উপর নির্ভর করে বাঁচি। বেশি কড়াকড়ি হলে কখন কোথায় যেতে পারবো, সেটাই অনিশ্চিত হয়ে যাবে।” স্থানীয়দের মতে, নিরাপত্তার কারণে নদীপথে নির্দিষ্ট সময়সীমা বা জোন নির্ধারণ হলে মৎস্যজীবীদের জীবিকা সংকটে পড়তে পারে। বসিরহাট ১নং ব্লকের ঘোজাডাঙা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় অনেকেই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ বলেন, “ঘোজাডাঙা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। সীমান্ত সুরক্ষা মজবুত হলে ব্যবসা আরও নিয়মতান্ত্রিক হবে, অবৈধ পণ্য যাতায়াত কমবে।” তবে কিছু পরিবার জানিয়েছেন, জমি অধিগ্রহণ হলে ক্ষতিপূরণ কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে মিলবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। টাকি পৌর এলাকার বাসিন্দারা আবার পর্যটনের বিষয়টিকেও সামনে আনছেন। এক হোটেল ব্যবসায়ী জানান, “টাকি পর্যটনের বড় আকর্ষণ ইছামতী নদী ও সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের দৃশ্য। অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ হলে পর্যটনের উপর প্রভাব পড়তে পারে।” তবে নিরাপত্তা জোরদার হলে পর্যটকদের আস্থাও বাড়তে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
হিঙ্গলগঞ্জে চিত্র আরও জটিল। সুন্দরবন ঘেরা জলসীমান্ত, খাঁড়ি ও নদীনির্ভর এই অঞ্চলে স্থল ফেন্সিংয়ের সুযোগ সীমিত। ফলে এখানে নৌ টহল, নজরদারি ক্যামেরা, অস্থায়ী আউটপোস্ট ও জলপথ পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। হিঙ্গলগঞ্জের সামশেরনগরের বাসিন্দা তথা মৎস্যজীবী রহিম সরদার বলেন, “রাতের নদীপথে অনেক অবৈধ কাজ হয়, সেটা বন্ধ হওয়া দরকার। কিন্তু আমরা যারা মাছ ধরি, তাদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র বা সহজ পারমিট ব্যবস্থা দরকার।”
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক প্রদীপ হালদার মনে করেন, সীমান্ত সুরক্ষা বাড়ানো জরুরি হলেও মানবিক দিকটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার কথায়, “শুধু নিরাপত্তা দেখলে হবে না। সীমান্তের মানুষদের জমি, জীবিকা, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়গুলোও একসঙ্গে ভাবতে হবে।”
সীমান্তবর্তী বহু পরিবারের অভিজ্ঞতা বলছে, আগেও কাঁটাতারের কারণে অনেকে নিজেদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্কুল, বাজার বা হাসপাতালে যেতে দীর্ঘ পথ ঘুরতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয়দের মতামত, সঠিক ক্ষতিপূরণ, বিকল্প রাস্তা এবং কৃষক-মৎস্যজীবীদের জন্য আলাদা সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে সীমান্ত সুরক্ষা জোরদারের উদ্যোগ বসিরহাটের সীমান্তবর্তী এলাকায় একদিকে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা মজবুত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অন্যদিকে সীমান্তবাসীর জীবনযাত্রা ও জীবিকার উপর বড় প্রশ্নচিহ্নও তুলে দিয়েছে। এখন নজর থাকবে, বাস্তবায়নের সময় প্রশাসন নিরাপত্তা এবং মানবিক স্বার্থ দুইয়ের মধ্যে কতটা ভারসাম্য রাখতে পারে তার উপর।
1 hour and 16 min ago
- Whatsapp
- Facebook
- Linkedin
- Google Plus
1- Whatsapp
- Facebook
- Linkedin
- Google Plus
0.1k