তিন দিনে কাঠে প্রাণ, জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম গড়ে উড কার্ভিং শিল্প বাঁচানোর লড়াই পিতা-পুত্রের
সৌমাভ মণ্ডল,বসিরহাট : শহর বসিরহাটের সাঁইপালা এলাকার বাসিন্দা কলা সরস্বতী শিল্পী তরুণ চন্দ্র এবং তার বাবা, প্রখ্যাত উড কার্ভিং শিল্পী সুবোল চন্দ্র, শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততায় দিন-রাত এক করে তৈরি করছেন কাঠের জগন্নাথ, বলভদ্র (বলরাম) ও সুভদ্রার বিগ্রহ। রথযাত্রা উপলক্ষে রথ কমিটির কাছ থেকে শেষ মুহূর্তের বায়না আসে। সময় ছিল হাতে মাত্র চার দিন। যে কাজ সম্পূর্ণ করতে সাধারণত অন্তত এক মাস সময় লাগে, সেই কাজই টানা তিন দিন-তিন রাত পরিশ্রম করে শেষ করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন এই পিতা-পুত্র জুটি।
উড কার্ভিং বা কাঠ খোদাই এমন এক প্রাচীন শিল্প, যেখানে ছেনি, বাটালি, হাতুড়ি, ছুরি কিংবা আধুনিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সাহায্যে কাঠে নকশা, মূর্তি ও নানা ধরনের শৈল্পিক সৃষ্টি করা হয়। এই শিল্পের মাধ্যমে তৈরি হয় দেবদেবীর বিগ্রহ, অলংকৃত দরজা-জানালা, আসবাবপত্র, নামফলক, শোপিস থেকে শুরু করে নানান উপহারসামগ্রী। সাধারণত সেগুন, শাল, গামারি, মহগনি, আম কিংবা নিম কাঠ ব্যবহার করা হলেও, তরুণ চন্দ্র ও সুবোল চন্দ্র জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহ তৈরিতে ব্যবহার করছেন নিম কাঠ। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ নির্মাণে নিম কাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তরুণ চন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত। তার শিল্পকর্মের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একাধিক সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছেন। কাজ করতে করতেই তিনি বলেন, "একটা জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার সেট তৈরি করতে সাধারণত প্রায় এক মাস সময় লাগে। কিন্তু রথ কমিটির অনুরোধে এবার হাতে মাত্র চার দিন সময় পেয়েছি। তাই বাবা-ছেলে মিলে দিন-রাত এক করে কাজ করছি। আমাদের কাছে এটা শুধু কাজ নয়, ভক্তি ও শিল্প দুটোই।"
অন্যদিকে, সুবোল চন্দ্রের হাত ধরে কয়েক দশক ধরে রাজ্যে বেঁচে রয়েছে এই প্রাচীন শিল্প। তার কথায়, "আগে এই কাজের খুব কদর ছিল। এখন অনেক শিল্পীই পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক না পেয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। আমরা এখনও এই শিল্প ছাড়িনি। যতদিন হাত চলবে, ততদিন কাঠে প্রাণ দেওয়ার কাজ করে যাব। নতুন প্রজন্ম যদি এগিয়ে আসে, তাহলে উড কার্ভিং আবার আগের সম্মান ফিরে পাবে।" এবার বসিরহাটের কাছে মেরুদণ্ডী এলাকার প্রায় ৮০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা কমিটি শেষ মুহূর্তে তাদের কাছে বিগ্রহ তৈরির বায়না দেয়। সময়ের স্বল্পতা সত্ত্বেও কাজ ফিরিয়ে না দিয়ে শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন তারা। দিনের আলো থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছেনি-বাটালির শব্দে মুখর তাদের কর্মশালা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিগ্রহ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন পিতা-পুত্র। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কাশ্মীর, রাজস্থান ও কর্ণাটক সহ বিভিন্ন রাজ্যে উড কার্ভিং শিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পর্যাপ্ত মজুরির অভাব, বাজার সংকুচিত হওয়া এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে ধীরে ধীরে এই শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেক কারিগর। ফলে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে শতাব্দীপ্রাচীন এই শিল্প।
তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও হাল ছাড়তে নারাজ তরুণ চন্দ্র ও সুবোল চন্দ্র। তাদের বিশ্বাস, শিল্পীর যথাযথ সম্মান ও প্রাপ্য মূল্য মিললে উড কার্ভিং শিল্প আবারও নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়াবে। তাই রথযাত্রার বিগ্রহ নির্মাণের পাশাপাশি নিজেদের শিল্পসাধনার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বসিরহাটের এই পিতা-পুত্র জুটি।
Jul 14 2026, 17:16
- Whatsapp
- Facebook
- Linkedin
- Google Plus
1- Whatsapp
- Facebook
- Linkedin
- Google Plus
3.0k